প্রচ্ছদ > রাজনীতি > বিএনপি

কিছুক্ষণ পরই নির্বাচনি ইশতেহার দেবে বিএনপি, কী থাকছে এতে?

article-img

এয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে কিছুক্ষণ পরই নির্বাচনি ইশতেহার দেবে বিএনপি। বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ইশতেহার ঘোষণা করবেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং পরিচালনা করবেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার ভোটে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান।সেই হিসেবে তারেক রহমানের এটি প্রথম নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা। 

পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম সংসদ নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেন প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ওই সময়ে প্রতিটি নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিলেও সেসময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি ছিলেন। ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর গুলশানের লেকশোরে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অধীনে দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি।এবার ভোটের মাঠে চমক দেখানোর অপেক্ষায় বিএনপি।

জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ৫ টি অধ্যায় থাকছে।প্রথম অধ্যায়ে থাকছে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার। এতে বলা হয়েছে, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হবে-'সবার আগে বাংলাদেশ'। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইনসাফ-ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ। মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, 'গণতন্ত্রের মাতা' দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং 'জুলাই জাতীয় সনদে' যে সব বিষয়ে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সেভাবে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ফ্যাসিবাদ ও বিদেশি তাঁবেদারিত্বের কোনো পুনরাবৃত্তি আর হতে দেওয়া হবে না। সমাজের সব স্তরে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করে একটি প্রকৃত 'জনকল্যাণমূলক সরকার' গঠন করা হবে এবং একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও বিকাশে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান

বিএনপির ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করা হবে। এতে বলা হয়েছে-মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭৫ সালে সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও ১৯৯০ সালে ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। রক্তার্জিত সেই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং বিপ্লব ও অভ্যুত্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত সেই গণতন্ত্র আবার রক্ষা ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা ও এর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নিজ-নিজ এলাকায় তাদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে। গণঅভ্যুত্থানে ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যেসব গণতন্ত্রকামী ব্যক্তি পঙ্গু হয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন তাদেরকেও স্বীকৃতি, সুচিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা দেওয়া হবে। শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান এবং তাদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সাংবিধানিক সংস্কার

সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ইং তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

জাতি গঠন

বিএনপির ইশতেহারে থাকছে, আমরা পাহাড়ে সমতলে যারাই আছি, আমাদের একটাই পরিচয় আমরা সবাই বাংলাদেশি। জাতির সব অংশ তথা ধর্মীয়, আঞ্চলিক ও নৃ-গোষ্ঠীগত পরিচয় এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে একটি সুসংহত জাতি গঠন করাই বিএনপির লক্ষ্য। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানো হবে। ৩১ দফা ঘোষিত 'ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন' এর আলোকে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি 'ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন' গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

সুশাসন

বিএনপি মনে করে, সুশাসন হলো গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি হবে ইনসাফ। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। দুর্নীতি ও অর্থপাচার দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা বিএনপির সুশাসন দর্শনের মূল। দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার।

২০০১ সালে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে দুর্নীতি দমনে বিএনপি সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায়। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নেয় তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের অপবাদ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্টক্ষতের মত ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। উন্মুক্ত দরপত্র, রিয়েল-টাইম অডিট, সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পের 'পারফরম্যান্স অডিট' এবং সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থপাচার রোধ ও ফ্যাসিস্ট আমলের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আইনের শাসনের নামে কোনো প্রকার কালা-কানুনের শাসন কিংবা বেআইনি নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল করা হবে। জুলাই-আগস্ট-২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানসহ ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। যে সব হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান শুরু হয়নি, সে সকল হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান শুরু করে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে। গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেধাভিত্তিক 'মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ গড়তে স্বচ্ছভাবে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন ও পিএসসি-কে শক্তিশালীকরণ, জবাবদিহিমূলক ও দলীয়করণমুক্ত জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত বিচার প্রাপ্তি ও বিচারসেবার আধুনিকায়ন করা হবে। বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন ও জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে জনবান্ধব ও সেবাবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনর্গঠন, অনলাইন অভিযোগ দায়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং পুলিশ কমিশন আইন পুনঃনিরীক্ষণ করা হবে।

স্থানীয় সরকার

বিএনপি বিশ্বাস করে, স্থানীয় সরকার হল গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র। ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধুমাত্র রাজধানী-কেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম ও শহরের স্থানীয় নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হলে জনমুখী, কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। উন্নয়ন কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমসহ জনগণের জন্য পরিষেবা প্রদানে স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করে স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধান করা এবং জনগণকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা দেওয়াই বিএনপির লক্ষ্য।

স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের নীতি অনুসরণ করে শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বৃদ্ধি করে খবরদারিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত করা হবে এবং বছরে অন্তত একবার উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে উন্মুক্ত জনসভা আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি বিলবোর্ডসহ উন্মুক্ত মাধ্যমে স্থানীয় সেবাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

ইশতেহারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে থাকছে বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন।